রাষ্ট্রদ্রোহী

সৈয়দ বোরহান কবীর
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ২৮ জুন, মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে ডিভিশন বেঞ্চ পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হাই কোর্ট বেঞ্চ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে একটি কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।  দুই মাসের মধ্যে কমিশনকে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। এ বিষয়ে আগামী ২৮ আগস্ট শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। হাই কোর্ট বেঞ্চ পদ্মা সেতুকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এ ধরনের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করে তাদের জাতীয় শত্রু বলে মন্তব্য করেন হাই কোর্ট।

বাংলাদেশে এই প্রথম একটি ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচনের জন্য সর্বোচ্চ আদালত সরাসরি নির্দেশনা দিলেন। এ নির্দেশনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলেন আদালত। জাতীয় শত্রু মানে দেশের শত্রু। যারা দেশের বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহীর সর্বোচ্চ সাজা হওয়া উচিত। আদালতের এ নির্দেশনার এক দিন পর বুধবার ইউনূস সেন্টার থেকে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়। এ বিবৃতিতে ড. ইউনূস তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ড. ইউনূসের মতো একজন গুণীজনের বিবৃতি অসংলগ্ন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ২০১১ সালে পদত্যাগ করতে বলায় গ্রামীণ ব্যাংকের মৌলিক আইনি মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি হাই কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছিলেন। এর সঙ্গে চাকরি ধরে রাখার কোনো সম্পর্ক নেই। ওমা! এ কী কথা! রিট পিটিশনটাই হলো ড. ইউনূসকে পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে। অথচ এখন তিনি বলছেন, এর সঙ্গে চাকরি ধরে রাখার সম্পর্ক নেই। পুরো বিবৃতি এ রকম জগাখিচুড়িতে ভরপুর। হাই কোর্ট কমিশন গঠনের নির্দেশনার পরপরই এ বিবৃতি দেওয়া হলো। এর কারণ সুস্পষ্ট। আগেভাগে তিনি দায়মুক্তির চেষ্টা করলেন। তার মানে গ-গোল তো কিছু আছে। না হলে এত দিন কোনো প্রতিবাদ নেই, আদালত কমিশন গঠন করতে বলার পর কেন এ বিবৃতি? কমিশন গঠনের আগেই তিনি বলছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রকারী নই’।

বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জন অনেক ত্যাগের বিনিময়ে। অনেক কষ্টের। আর প্রতিটি অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নানা ষড়যন্ত্র। কখনো দেশে, কখনো বিদেশে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আবার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্জনকে বানচাল করার সব চেষ্টা করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে খুনি মোশতাক চক্র ষড়যন্ত্র করেছিল। যুদ্ধের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন প্রস্তাব নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছিল। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ এটা টের পেয়ে মোশতাককে পররাষ্ট্র দফতর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল বাঙালির অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এ হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল আওয়ামী লীগের ভিতরেই। ২০০৭ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি বানচালের জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিল। সেই ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা ছিল আমাদের সুশীলসমাজের একটি অংশ। লোভী ও চতুর সুশীলদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কিছু কাপুরুষ রাজনীতিবিদ। পদ্মা সেতু নিয়েও ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

এ ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিল সুশীল শিরোমণি ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশের স্বনামধন্য কিছু ব্যক্তি। এসব ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশকে থামিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিনাশ। সব ষড়যন্ত্রই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, আমরা একটি ষড়যন্ত্রেরও স্বরূপ উন্মোচন করতে পারিনি কিংবা আগ্রহ দেখাইনি। একটি ষড়যন্ত্র আরেকটি ষড়যন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা তা নিয়ে একটি কমিশন গঠনের দাবি উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের পর। বঙ্গবন্ধু সে সময় দেশ গড়ার কাজেই মনোযোগী ছিলেন। এজন্য কমিশন গঠনে আগ্রহী হননি। জাতির পিতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। দালাল আইন করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ-দেশি দোসরদের বিচার শুরু করেছিলেন। এ বিচার অব্যাহত থাকলে মুখোশধারী স্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করা যেত।

তাদের আওয়ামী লীগ এবং সরকার থেকে আলাদা করা যেত। কিন্তু সে প্রক্রিয়া নস্যাৎ করে দেয় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। ’৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে নিরন্তর কাজ করেন। জনমত গড়ে তোলেন। মানবাধিকারের জন্য আন্দোলন করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করেন। আত্মস্বীকৃত বেশ কয়েকজন খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের তদন্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন নেতা কয়েক বছর ধরে এ ব্যাপারে একটি ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি করছেন।

গত বছর জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের তদন্তে একটি ‘জাতীয় কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা জাতির পিতার হত্যার বিচার করেছি, কিন্তু এই নীলনকশার তদন্ত করতে পারিনি।’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জাতীয় শোক দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আগস্ট ষড়যন্ত্রের নানা বিষয় উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘এত বড় দল, এত নেতা কেউ এগিয়ে এলো না। একটা প্রতিবাদ মিছিল করতে পারল না কেন?’ আগস্ট ট্র্যাজেডি নিয়ে ভাবলেই অনেক প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার সব সদস্য কেন ভেড়ার পালের মতো সুড়সুড় করে বঙ্গভবনে খুনি মোশতাকের আজ্ঞাবহ ভৃত্য হলো? তিন বাহিনীর প্রধানরা কেন পুতুলের মতো নীরব-নিথর থাকলেন? জিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে বদলির আদেশ বাতিলে কে বা কারা বঙ্গবন্ধুকে প্ররোচিত করেছিল? ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। আগস্ট ট্র্যাজেডির সময় যারা চারপাশে ছিলেন তাদের অনেকেই চলে গেছেন। আর কিছুদিন পর সত্য অন্বেষণে সাক্ষীও পাওয়া যাবে না।

আওয়ামী লীগ সরকার কেন আগস্ট ষড়যন্ত্রের মূল উদ্ঘাটনের জন্য একটি কমিশন এখনো করল না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না। ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের চেনা কুশীলবরা এখন কেউ বিদেশে, কেউ দেশে বহাল। এ বিষয়ে ১-১১-এর বিরাজনীতিকরণের নীলনকশা বাস্তবায়ন হয়নি শেখ হাসিনার সাহস এবং দৃঢ়তার জন্য। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন হয়নি আজও। ড. ইউনূস ওয়ান-ইলেভেনের আগেই কেন নোবেল পুরস্কার পেলেন? তা-ও আবার শান্তিতে! যৌথভাবে (গ্রামীণ ব্যাংক ড. ইউনূস) নোবেল পুরস্কার কীভাবে এক ব্যক্তির অর্জন হিসেবে প্রচার হলো সে-ও এক প্রশ্ন। ড. ইউনূসের নোবেল জয়ের পরপরই রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা।

সেই রাজনৈতিক দলে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের যোগদান! নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত। জনগণকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেওয়া। দুটি প্রথম সারির দৈনিকে (একটি বাংলা, একটি ইংরেজি) বিরামহীনভাবে রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন। তারপর ড. ফখরুদ্দীনের মতো এলিট আমলাকে সিংহাসনে বসানো। সবকিছু নিখুঁত নীলনকশার পরিপাটি বাস্তবায়ন। এরপর ড. কামাল হোসেনের সাংবিধানিক ফতোয়া দিয়ে অবৈধ অনির্বাচিত সরকারকে বৈধতা দেওয়া। দুই সম্পাদকের বিরামহীনভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তোষণ।

একজন স্বনামে কলাম লিখলেন, ‘দুই নেত্রীকে সরে যেতেই হবে’। অন্যজন গোয়েন্দা সংস্থার চিরকুট যাচাই-বাছাই না করেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পটভূমি তৈরি করলেন। সব যেন এক সুতোয় মালা গাঁথার মতো। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ১-১১-এর ঘটনার তদন্ত কমিশন গঠিত হওয়া প্রয়োজন ছিল; কিন্তু হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত না হওয়ার জন্যই খুনি মোশতাক জাতির পিতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঠিক তেমনি, ১-১১-এর কুশীলবদের ব্যাপারে তদন্ত না হওয়ার কারণেই এরা পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র করার সাহস পেয়েছিল। ১৯৭১, ১৯৭৫, ২০০৭ এবং ২০১১-এর ষড়যন্ত্র একসূত্রে গাঁথা। এসব ষড়যন্ত্র আসলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। আবার ’৭১ ও ’৭৫-এর ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা যেমন ছিল এক ও অভিন্ন। তেমনি ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরাই পদ্মা সেতু না হওয়ার ষড়যন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ’৭১ ও ’৭৫-এর ষড়যন্ত্রকারীরা যুদ্ধাপরাধী, খুনি। আর ২০০৭ ও ২০১১-এর ষড়যন্ত্রকারীরা হলো গণতন্ত্রবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী।

পদ্মা সেতুতে ড. ইউনূস কেন বাধা দিয়েছিলেন? কেনই বা তাঁর সঙ্গে ১-১১-এর কুশীলবরা যোগ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণে ষড়যন্ত্র নিয়ে যতবার কথা বলেছেন ততবার ড. ইউনূস প্রসঙ্গ এসেছে। ড. ইউনূস ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চাকরির একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নির্ধারিত বয়স অতিক্রান্ত হয়েছিল বহু আগেই। বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে অবসরে পাঠায়। ড. ইউনূস বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান। সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক। এরপর ড. ইউনূস শুরু করেন দেনদরবার-তদবির।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও টেলিফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রচ্ছন্ন ধমকও দেন। কিন্তু হিলারি-ইউনূস কেউই সম্ভবত বুঝতে পারেননি শেখ হাসিনা অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি শেখের বেটি। এসব চাপের কাছে নতিস্বীকার তিনি কখনই করবেন না। এর পরই অন্য চাপ। সে চাপটি হলো পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ। মহাজনী ব্যবসায় বেড়ে ওঠা ড. ইউনূস জানতেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হলে অন্য দাতারাও সরে যাবে। আমার মনে হয়, ড. ইউনূস বুঝতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে আর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ফিরতে পারবেন না। এজন্য তিনি শেখ হাসিনা সরকারকেই সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে নেমেছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ হারিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ দখলের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। ঘটাতে চেয়েছিলেন আরেকটি ১-১১।

পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ ছিল আসলে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র। ২০১২ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণচুক্তি বাতিল করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর আগে। এ সময় যদি আমরা ‘মাইনাস ফরমুলার প্রবক্তা’ দুটি সংবাদপত্রে চোখ রাখি, দেখব দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে নানা গল্পকাহিনি। ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. শাহদীন মালিকসহ আরও কতিপয় সুশীল পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি প্রমাণে কলমযোদ্ধা হয়ে গেলেন! পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক সরে আসা নিয়ে সে সময় কে কী বলেছেন তা ইতোমধ্যে দেশের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। সে প্রসঙ্গ এখানে আর উল্লেখ করতে চাই না; কিন্তু এই সংঘবদ্ধ সাঁড়াশি আক্রমণের লক্ষ্য ছিল একটাই- সরকারকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ। এ সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারবে না- এটি প্রমাণের চেষ্টা। সুশীলরা ক্ষমতায় আসে রাজনৈতিক শক্তির ঘাড়ে চড়ে। ২০০৭ সালে সুশীলরা বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল।

ইয়াজউদ্দীনকে দিয়ে একের পর এক এমন সব সিদ্ধান্ত সে সময় বিএনপি নিয়েছিল, যাতে ন্যূনতম সুষ্ঠু নির্বাচনের পথও রুদ্ধ হয়েছিল। ২০১২ সালেও সুশীলরা আরেকটি ‘অনির্বাচিত’ অধ্যায় শুরুর নীলনকশা করেছিল বিএনপিকে মাথায় রেখে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ সময় মাঠে নামলেন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে। বক্তৃতায় বলতে শুরু করলেন, এ সরকারের আমলে পদ্মা সেতু হবে না। পদ্মা সেতু জোড়াতালি দিয়ে হচ্ছে। এমন অবাস্তব, হাস্যকর কথা বলে তিনি সুশীলদের ক্রীড়নকে পরিণত হলেন।

২০১৩ সালের সব সিটি করপোরেশনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস যখন তুঙ্গে ঠিই তখনই বেগম জিয়া জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেন। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সার্টিফিকেট আর বেগম জিয়ার নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা- দুইয়ে মিলে সুশীলদের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত। ওয়ান-ইলেভেনের আগে দুই সুশীল সম্পাদক যা করেছিলেন, ঠিই একই ভূমিকায় আবার মাঠে নামলেন। কিন্তু তাঁরা বোধহয় কার্ল মার্কসের অমর বাণীটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। মার্কস বলেছিলেন- ‘ইতিহাসে একই ঘটনার একই রকম পুনরাবৃত্তি হয় না।’ ২০১৪ সালের নির্বাচন হলো। ২০০৭-এর মতো আরেকটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারল না। ফলে ‘পদ্মা সেতু’ ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটানোর চক্রান্ত ভেস্তে গেল। এ ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেল শুধু একজন মানুষের জন্য। তাঁর নাম শেখ হাসিনা।

ওয়ান-ইলেভেনের মতো এ সময়ও আওয়ামী লীগের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা যাবে না।’ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তি বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে ঋণচুক্তি আবার চালুর জন্য ওয়াশিংটনে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সুবিধা হলো, তিনি ভবিষ্যৎটা খুব ভালো দেখতে পান। তিনি জানতেন কারা পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। কেন করছেন। ২০১২ সালের ৪ জুলাই সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মতামত উপেক্ষা করে তিনি জাতীয় সংসদে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ৮ জুলাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ৯ জুলাই এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এরপর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অবিশ্বাস্য যুদ্ধ।

এ কারণেই ২৯ জুন বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা, আমাদের প্রত্যয়। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর মুখ দেখেছি।’ সুশীলদের বিরুদ্ধে এটি ছিল শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বিজয়। এ সুশীলরাই ২০০৭ সালে শেখ হাসিনাকে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বানানোর এক কুৎসিত নোংরা খেলায় মেতেছিলেন। একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। ঠিক পাঁচ বছর পর ওই একই চক্র ‘পদ্মা সেতু’ নাটক করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবারকে দুর্নীতির কালিমা দিতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনাকে আবার রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু ১-১১-এর সময় শেখ হাসিনা যেমন করে সততার আলোয় সব অসত্যের অন্ধকার দূর করেছিলেন, তেমনি ২০১২ সালেও তিনি হিমালয়ের মতো সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রমাণ করেছিলেন তিনিই সত্য।

এ দেশে কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষণ অন্যের অনিষ্ট চায়। নিজেদের হাজারো পাপ, কিন্তু তারা ব্যস্ত অন্যের খুঁত খোঁজায়। জনগণের মঙ্গল, কল্যাণ, ভালো- সবকিছু তাদের খুব অপ্রিয়। এ গোষ্ঠী দেশে গণতন্ত্র চায় না। উন্নয়ন দেখলেই দুর্নীতি খোঁজে। বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ালে তারা হাহাকার করে। বিদেশি প্রভুদের নির্দেশই তাদের জন্য অমর বাণী। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সামনে এ দেশের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। পদ্মা সেতু প্রমাণ করে দিয়েছে তারা সত্য বলেন না। তারা দেশের মঙ্গল চান না। উন্নয়ন চান না। আমরা আশা করি শিগগিরই কমিশন গঠিত হবে। পদ্মা সেতু উন্মোচনের মতো ভদ্রলোকের মুখোশ পরা রাষ্ট্রদ্রোহীদের চেহারা উন্মোচিত হবে। সেদিন না হয় আমরা আরেকটা উৎসব করব।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

Share This Article


কুখ্যাত ওয়াগনার ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইউক্রেনের হামলা

রাতের আঁধারে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সিরিয়ার ৩ সেনা নিহত

হিরো আলম অবশ্যই ট্যালেন্ট: মিশা সওদাগর

সাভারে এখনো বঙ্গবন্ধুর খুনির বাবার নামে চলছে স্কুল

রাজধানীর চকবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে

সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হবে : সোহেল তাজ

কত দেশ এখন মন্দার শঙ্কায়

টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

রাজধানীর চকবাজারে পলিথিন কারখানায় আগুন

কিমকে চিঠিতে কী লিখেছেন পুতিন?

তাজমহলে একদিনে রেকর্ড ৮০ হাজার দর্শনার্থী!

মালদ্বীপের হেড কোচ হলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার

মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ: কাদের

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের শহীদদের শ্রদ্ধা প্রধানমন্ত্রীর