পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মাসুদ আকবানীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও আইএসআই কানেকশনের গুরুতর অভিযোগ

হুন্ডির মাধ্যমে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে আসছেন এক বিদেশি। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মাসুদ দাউদ আকবানীর বিরুদ্ধে গুরুতর এই অভিযোগ। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

দুর্নীতির অর্থে মাসুদ আকবানী নারায়ণগঞ্জে এসিএস টেক্সটাইল (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং এসিএস টাওয়েল লিমিটেড নামে দুটি টেক্সটাইল মিলও গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপসহ বিদেশে অর্থপাচারে প্রতিষ্ঠান দুটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থাটির এই প্রতিবেদন ধামাচাপা দিতে নানামুখী তদবির চালাচ্ছেন মাসুদ দাউদ আকবানী। চালাচ্ছেন নানান অপচেষ্টাও। তবে আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে দাউদ মাসুদের যোগাযোগ ও অর্থ প্রদানের বিষয়ে তদন্তে নেমেছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আকবানী তার প্রতিষ্ঠান দুটির মাধ্যমে অর্থপাচারসহ বাংলাদেশে ‘পাকিস্তানি অস্তিত্ব’ সুদৃঢ় করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এমনকি তার প্রতিষ্ঠানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার, কর ফাঁকি দেওয়াসহ উর্দু ভাষার প্রচলন ঘটাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আকবানীর প্রতিষ্ঠান দুটিতে কর্মরত নারী কর্মীদের পাকিস্তানি পুরুষ কর্মীদের দিয়ে যৗন হেনস্তা করারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও আকবানীর বিভিন্ন রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়ও উঠে এসেছে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পে কোয়ালিটি, প্রোডাকশন এবং ইলেকট্রিক্যাল লাইনে দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও এসব সেকশনে পাকিস্তানি নাগরিকরা কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠান দুটিতে অনেক পাকিস্তানি ৮-৯ বছর যাবৎ কর্মরত।

বিডার নিয়ম অনুযায়ী, ৫ বছরের অধিক কর্মরত থাকার কথা না থাকলেও এসিএস টেক্সটাইলে পাকিস্তানিদের চাকরি ৫ বছর হলে পুনরায় একই ব্যক্তির কাগজপত্র এসিএস টাওয়েল লিমিটেডের ঠিকানায় আপডেট করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যক্তিরা একই ভবনের মধ্যে পূর্বের পদবি অনুযায়ী পূর্বের কর্মস্থলেই কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা বিডা কর্তৃপক্ষকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে থাকেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিষ্ঠান দুটি শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং বন্ড প্রতিষ্ঠান হলেও বন্ডের ডিউটি ফ্রি ভাইস-কেমিক্যাল আমদানি করে লোকাল মার্কেটে বিক্রি করা হয়। এছাড়া কয়েকটি লোকাল টেক্সটাইল মিলের পণ্য (ক্লাসিক্যাল হোমস) এই কারখানায় ডাইং ও প্রিন্টিং করা হয়, যা অবৈধ।

এই অভিযোগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর উক্ত প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ওই অবৈধ কার্যক্রম এখনও অব্যাহত আছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি আকবানী প্রায়ই হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাঠান। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে, ইউকের ম্যানচেস্টারে ও সুইডেনের মালমোতে হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত লাখ লাখ ডলার পাঠানো হয়। বিশেষ করে বায়ার কর্তৃক কোনো পণ্য রিজেক্ট হলে উক্ত জরিমানার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয় বলে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

সম্প্রতি তিনি কানাডার টরেন্টোতে হুন্ডির টাকায় একটি বাড়ি কিনেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। তার কারখানায় তিতাস গ্যাস কোম্পানির অনুমোদন ব্যতীত অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এছাড়া রাতে ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) না চালিয়ে সরাসরি কারখানার বর্জ্য পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যেভাবে উত্থান আকবানীর:

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসুদ দাউদ আকবানী ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ইপিজেডে আজমত টেক্সটাইলে কর্মরত থাকাকালীন (তার তৎকালীন পাকিস্তানি পাসপোর্ট নং-এ ৪৪১০০৯) তদানীন্তন বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন।

আকবানীর দুর্নীতির কারণে আজমত টেক্সটাইল দেউলিয়া হলে তিনি ১৯৯২ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিনের প্রতিষ্ঠান অলটেক্স লিমিটেডে যোগদান করেন। ১৯৯৩ সালে দুর্নীতির অভিযোগে সেখান থেকে বরখাস্ত হন। ১৯৯৪-৯৬ সালে এপেক্স ওয়েভিং এন্ড সাত্তার টেক্সটাইল লিমিটেডে কাজ করেন।

তদন্তে গোয়েন্দা সংস্থা আরও জানতে পেরেছে, ১৯৯৭-২০০৪ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে জাবের এন্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স নামক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালীন আকবানী প্রচুর টাকার মালিক হন।

২০০৪ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এসিএস টেক্সটাইল (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং এসিএস টাওয়েল লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠান দুটির একক কর্ণধার।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে এসিএস টেক্সটাইলে দুজন ব্রিটিশ নাগরিকের অংশীদারিত্ব ছিল। আকবানী ওই ব্রিটিশ নাগরিকদের যৎসামান্য কিছু অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ফেরত দিয়ে কৌশলে সেখানে নিজের ছেলে ও মেয়েকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন।

আকবানীর প্রতিষ্ঠানে যা হচ্ছে:

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নীতি অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান মোট কর্মচারীর (সুপারভাইজার ও তদূর্ধ্ব) শতকরা ৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু এসিএস টেক্সটাইলে মোট কর্মচারী ৮০০ জনের মধ্যে ৯৭ জন এবং এসিএস টাওয়েল লিমিটেডে মোট কর্মচারী ১৬০ জনের মধ্যে ২০ জন বিদেশি রয়েছেন।

ওই দুটি প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে ব্যতিক্রম যেখানে ১০০ জনের বেশি পাকিস্তানি নাগরিক কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠানের মালিক অনেক অভিজ্ঞ পাকিস্তানি তথা নিজের আত্মীয়স্বজনকে উচ্চ বেতনে চাকরি দিয়ে সেখানে কাজ শেখান বলে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

বিডার নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠান দুটিতে অর্ধশত পাকিস্তানি নাগরিক তাদের ওয়ার্ক পারমিট এবং নিয়োগপত্রে উল্লেখিত পদবির চেয়ে উচ্চপদে কর্মরত রয়েছেন। ওয়ার্ক পারমিটে থাকা বেতন অপেক্ষা তাদের প্রকৃত বেতন বেশি বলেও উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

প্রতিষ্ঠান দুটিতে উর্দু কথা বলতে উৎসাহিত এবং উর্দু জানা কর্মীদের দ্রুত বেতন বৃদ্ধি ও প্রমোশন দেওয়া হয়। এছাড়া ভুয়া সম্মতিপত্র নিয়ে বাংলাদেশি মহিলা শ্রমিকদের ১৫-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। কারখানায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নির্যাতন করার পাশাপাশি পাকিস্তানি কর্মীদের দ্বারা বাংলাদেশি মহিলা কর্মীদের শ্লীলতাহানি ঘটানোরও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসসহ বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় দিবসে প্রতিষ্ঠান দুটি চালু রাখেন আকবানী।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আকবানী বিএনপি ও পাকিস্তানি হাইকমিশনের সঙ্গে লিয়াজোঁ স্থাপন করেন মিথুন ঢালী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানি হাইকমিশনের সাথে আকবানী সবসময় সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। প্রতিবছর ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে আকবানী পাকিস্তানি দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন এবং বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন পাঠান। তাকে এই কাজে সহযোগিতা করেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাহাব আইজাজ।

আকবানী প্রতিষ্ঠান দুটিতে পাকিস্তানিদের ৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে পুনরায় একই ব্যক্তির কাগজপত্র অপর প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় আপডেট করার মাধ্যমে বিডার নির্দেশনা অমান্য করছে। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কর ফাঁকি দিচ্ছে।

আকবানীর প্রতিষ্ঠান দুটি ডিউটি ফ্রি ভাইস-কেমিক্যাল আমদানি করে লোকাল মার্কেটে বিক্রির মাধ্যমেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিচ্ছে। এছাড়া কারখানায় অনুমোদন ব্যতীত অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিচ্ছে বলেও গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।